ভুতুড়ে গ্রামটি হারিয়ে যাবে?

পলেস্তারা খসে পড়া বাড়িটির সামনে বিরস মুখে দাঁড়িয়ে ৭৭ বছরের ইয়াকুব ওদেহ। এখানেই শৈশব কেটেছিল তাঁর। পড়ে আছে সেই পাথরের চুলা, যাতে আগুন জ্বেলে রুটি সেঁকতেন মা। এখানে এসে মাটির ঘ্রাণ নিতে পেরে ওদেহ মোহিত। একই সঙ্গে তিনি ব্যথিত যে এখানে আর থাকা হবে না তাঁর।

কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই সব সোনালি দিন। শুধু বাড়ি নয়, পুরো গ্রামটিই এখন ইয়াকুবের কাছে স্মৃতি। গ্রাম ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে। তখন কতই বা বয়স ইয়াকুবের। এই—ছয়-সাত।

ইয়াকুব একা তো নন। ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেমের পাহাড়ের ধারের লিফতা গ্রাম থেকে সে সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করা হয়। গ্রামটি এখন জনশূন্যই বলা চলে। দাঁড়িয়ে আছে কেবল পাথরের বাড়িগুলো। আছে জলপাই, কাঠবাদামের গাছ। বাড়ির বিশাল ফটকগুলোও অবিকল। কিন্তু সেগুলো দিয়ে কেউ আর ভেতরে ঢোকে না। গ্রামে নেই মানুষ। যেন ভুতুড়ে গ্রাম।

প্রচণ্ড গরমে এই জলাশয়ে সাঁতার কাটত গ্রামবাসী। ছবি: এএফপি

 

ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা অবশ্য যৌথভাবে এখন এই গ্রামটি সংরক্ষণের চেষ্টা করছে। শহরের উন্নয়ন, বাণিজ্যিক এলাকা, হোটেল গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ডের তালিকায় উঠেছে লিফতা গ্রামের নাম।

উইকিপিডিয়া বলছে, ২০১০ সালে জনশূন্য এই লিফতা গ্রাম রক্ষায় গঠিত হয় ‘সেভ লিফতা কোয়ালিশন’। ইসরায়েলও এই সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত। সেভ লিফতা কোয়ালিশন চায় গ্রামটি ঐতিহাসিক ক্ষেত্র হিসেবে রক্ষা করতে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন ও খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশে দেরি হচ্ছে।

এই পরিকল্পনায় আশা জেগেছে ইয়াকুবসহ অন্যদের মনে। এখন তাঁরা স্বপ্ন দেখছেন নিজের ঘর ও জমি ফিরে পাওয়ার। কিন্তু বাস্তবায়ন কবে হবে বা কবে তাঁরা ফিরতে পারবেন, জানেন না কেউ।

বাসিন্দারা চান, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, এর সাক্ষী হয়ে থাকুক গ্রামটি। আরব-ইসরায়েলের ওই যুদ্ধে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিসহ আরব দলগুলোর মধ্যে যুদ্ধ চলে। আরব লিবারেশন আর্মি ও ফিলিস্তিন আরবদের মধ্যে সংঘর্ষ চলে। এর প্রভাব পড়ে লিফতা গ্রামে। সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয় ফিলিস্তিনিদের। ভয়াবহ সেই সময়টি নাকবা নামে পরিচিত স্থানীয় লোকজনের কাছে। ১৯৪৮ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় ইসরায়েল।

সে সময় অন্যদের মতো লিফতা গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ইয়োনি ইউহানান। বললেন, তিনি চান প্রিয় গ্রামটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সুরক্ষিত থাকুক।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্রামটি রক্ষা করতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। ইসরায়েল ভূমি প্রশাসনের মুখপাত্র ওরতাল তাজাবর বলেছেন, গ্রামটির উন্নয়েন একটি নির্মাণ নকশা করা হয়েছে, যা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। তবে যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ ওই গ্রামের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। তখন আর গ্রামের সেই আগের চেহারা থাকবে না।
এএফপি অবলম্বনে

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*