এই উৎসব গৌরবের, এই উৎসব আনন্দের

‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় কবি নির্মলেন্দু গুণ ১৯৭১-এর ৭ মার্চের সেই পড়ন্ত বিকেলের কথা শুনিয়েছেন। সেই বিকেলে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বজ্রকণ্ঠে বলে উঠেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’ নির্মলেন্দু গুণের কাছে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ছিল বাংলার অমর কবিতা। ‘গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে’ সেই কবিতা শুনিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে।

ছয় ৪০ বছর চলে গেছে। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আজ বঙ্গবন্ধু নেই। আছে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ, আছে সেই উদ্যান আর অগণন মানুষ।

আজ শনিবার হেমন্তের এই বিকেলে কবি নির্মলেন্দু গুণ পড়ে শোনালেন তাঁরই লেখা কবিতাটি, সেই উদ্যানে। বললেন, ‘ইউনেসকো আজ যখন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই ভাষণটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন বাঙালি-বাংলাদেশের মানুষেরা আনন্দিত বোধ করছে। সেই হিসেবে আজকের এই উৎসব গৌরবের, এই উৎসব আনন্দের।’

এই আনন্দের উৎসবে আজ সকাল থেকেই শামিল হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। স্লোগানে-গানে-কবিতায় মুখরিত ছিল উদ্যান। নাগরিক কমিটির আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

নাগরিক সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখ লাখ মানুষের সামনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু । যে ভাষণ এ দেশের মানুষকে আন্দোলিত করেছিল। তাঁর ভাষণের মাধ্যমে একটি নতুন জাতির জন্ম হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে বাঙালিদের কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ভাষণ অনুবাদ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিতে পারি, যাতে যেসব দেশ শোষণ মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছে, তারা এই ভাষণ থেকে শক্তি অর্জন করে, অনুপ্রেরণা লাভ করে। বঙ্গবন্ধু একান্ত আমাদের, কিন্তু তিনি বিশ্ববাসীর। তাঁর ভাষণের যে শক্তি, তা বিশ্ববাসীকে উদ্দীপ্ত করুক, এটাই কামনা করছি।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশি পাকিস্তানিরা’ এখনো সক্রিয়। আজও তারা এ দেশের স্বাধীনতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়, আজও তারা বাংলাদেশিদের গোলামি করাতে চায়। তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা বঙ্গবন্ধুর নামে শপথ নেই। কোনো দিন আমরা বঙ্গবন্ধুর শপথ বিস্মৃত হব না, বাংলাদেশি পাকিস্তানিদের ক্ষমতায় আনব না।’

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিভিন্ন দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে এই ভাষণটি স্কুল পর্যায়ের বইয়ে ছাপানো হয়। অষ্টম শ্রেণিতে এটা পড়ানো হয়। যে ভাষণ বঙ্গবন্ধু ১৮ মিনিটে দিয়েছিলেন, সেই ভাষণ শ্রেণিকক্ষে পড়াতে ছয় দিনে ছয়টি ক্লাসের প্রয়োজন হয়। তাঁর ভাষণের প্রতিটি লাইনে বাঙালির অধিকার আদায়ের ভাষা ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে অন্তরে ধারণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, গ্রাম বদলে গেছে, সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেখানে দারিদ্র্য নেই। বর্তমান সরকার যেসব উন্নয়ন করছে, তার প্রচার নেই। জনে জনে এই সরকারের কাজ বলতে হবে। আর মানুষকে বলতে হবে, এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশে ইউনেসকোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিয়েট্রিস কালদুন বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে সফলভাবে একটি দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণ নতুন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ঘটনা, যেটি এখনো মানুষকে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। সত্যিই এটি ইতিহাসের বাঁক বদল করেছিল।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। আমার সামনে ৫০ জন কিংবা খুব বেশি হলে ১০০ জন ছেলেমেয়ে থাকে। কিন্তু আজকে এখানে যখন দাঁড়িয়ে কথা বলছি, আমার সামনে লাখ লাখ মানুষ। এটি কী অসাধারণ অভিজ্ঞতা, আমি জানি না। আমাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’ তিনি বলেন, পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যে দাবি করতে পারবে একটি দেশ এবং একটি মানুষ সমার্থক। বাংলাদেশের মানুষেরা সেই দাবি করতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না।

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর বক্তব্য শেষ করার আগে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেন, তখন সমবেত জনতা তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য শাখায় স্বীকৃতি দেওয়ায় ইউনেসকোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*